একজন সুখি বেকার মানুষের আমড়া গাছে ঝুলাঝুলি ও আমরা

amra-gach

মানুষ যখন স্রশ্ঠার বিশাল কোন সৃষ্টির সামনে দাড়ায় তখন বুঝতে পারে সে নিজে কত ছোট। সুবিশাল পাহাড়ের সামনে বা দিগন্তবিহীন সাগরের সামনে দাড়ালে আমার অন্তত তাই মনে হয়, শুনেছি অন্যদেরো তাই হয়। আমি বুঝে পাইনা, যে মানুষ পাহাড় ভালোবাসে সাগর ভালোবাসে সে কেনো হবে এত অহংকারি!!


এটিএন এ মুসা ইব্রাহিম বাবু ভাইকে সম্মোধন করলেন বেকার মানুষ হিসাবে [রেফ: https://www.youtube.com/watch?v=_WiOSIWyEfQ] !!! মানে কি? কি রকম ভদ্রতা এইটা? এই টকশোতে তো জীবিকার জন্য কে কি কাজ করে সেটা নিয়ে তো আলাপ হচ্ছে না, কি আজব।

ব্যাক্তিগত ভাবে বাবু ভাইয়ের সাথে পরিচয় অনেক বছর, লোকটা এদিক ওদিক একটু আকটু প্যাঁচ লাগালেও আসলে অনেক উপকারি এবং নিতান্তই ঝামেলাহীন একজন মানুষ। আমরা সদ্য পাহাড়ে (৮০০-৯০০ মিটার) চড়া কিছু পোলাপান যখনই ইন্টারেস্ট দেখিয়েছি তখনই উনি ৪০ কেজি গিয়ার দড়ি পিঠে চাপিয়ে চলে এসেছেন আমাদের ক্লাইম্বিং শিখাতে, জুমারিং করতে। হোক সেটা রমনা পার্কের বড় কোন গাছে বা রাহাতের গ্রামের বাড়ির আমড়া গাছে বা কচুর ঝোপে। এমনকি সেন্ট মার্টিনে পর্যন্ত উনি আমাদের সাথে গেছেন উনার সেই বিশাল হাতে বানানো ব্যাকপ্যাক বা ক্লিফলাইনের কলকাতায় বানানো ঢাউস ক্যানভাসের ব্যাকপ্যাক নিয়ে (উনারো হয়তো একটা মাউন্টেন হার্ডউয়ার বা নর্থফেসের শখ থাকতে পারে, কিন্তু বেকার!! মানুষ, এত টাকা কই পাবেন)। মনে পড়ে সেন্টমার্টিন যাওয়ার সময় আমাদের কয়েকজনকে দিয়েছিলেন উনার ফ্লিপার আর স্নোরকলের সেট টা যেটা নৌকা ডুবি হয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। এগুলি সবই ৪-৫ বছর আগের কথা। ঐ সময় ঢাকা শহরে কয়জনের কাছে ফুল ক্লাইম্বিং গিয়ার ছিল জানতে খুব ইচ্ছা করে, আর কয়জনই বা সেটা উতসাহ ভরে বিনা মজুরি তে আন্যদের শিখাতেন নিজের টাকা খরচ করে সেটাও জানার বিষয়। আমার জানা মতে বাবু ভাই ই একমাত্র মানুষ এই দেশে যে মাউন্টেনিয়ারিং এর বেসিক, এডভান্স, ইন্সট্রাকটর, সার্চ এন্ড রেসকিউ সব গুলা ট্রেনিং গুলে খেয়ে ফেলেছেন হাসি মুখে 🙂

এবার আসি আসল কথায়। জীবিকার প্রয়োজনে সবাইকেই কিছু না কিছু করতে হয়, আমরা ছোট থেকেই শিখে আসছি (কেউ কেউ মনে হয় এই শিক্ষা পায় না ছোট বেলায়) কোন কাজকেই ছোট করে না দেখতে। এটি এন নিউজের টকশো তে বাবু ভাই যখন মুসা এবং তার দলের (যেটাতে বাবু ভাই ও ছিলেন) মিথ্যা সামিট ক্লেইম নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন তাকে মুসা যেভাবে ব্যাক্তিগত ভাবে আক্রমন করলেন তা খুবই লজ্জাজনক, বাবু ভাই হয়তবা জীবিকার জন্য কারো চাকর না (যারা চাকুরি করে তারা তো চাকরই তাইনা?) তাই বলে তাকে বেকার বলাটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

আমি যদি আমার বাসার কাজের বুয়া কে চাকর ভাবি তাহলে আমিও তো চাকর কোন এক সংস্থার। যে লোকটা সারাদিন মাটি কাটে বা রিকসা চালায় তার কাছে তো যারা খবরের কাগজে লেখালেখি করে তাদেরকে বেকার মনে হবে, মনে হবে কাজ নাই তাই লেখালেখি করে (আমার যখন কাজ থাকে না যেমন আজকে ছুটির দিনে, আমিও লিখালিখি করি)। যে লোকটা টাকার জন্য নিলখেতে টাইপ করে আর যে টাকার জন্য পেপারের জন্য লেখে পার্থক্য কতটুকু? যে লোকটা ছেড়া ছালা/বস্তা পড়ে রমনা পার্কে শুয়ে পাখি দেখে আর যে লাখ টাকার ক্যামেরা নিয়ে জন্গলে চরে পাখি খুঁজে তার পার্থক্য কোথায়? ৩ নাম্বার বাসের ড্রাইভার আর বিমানের ড্রাইভার, পার্থক্য কোথায়, ২ জনই টাকার জন্য পাবলিক বাহন চালায় অন্যের হয়ে। যে ভবঘুরে পাগলা দেশের এক জেলা থেকে আরেক জেলা ঘুরে বেরায়, চাল চুলা নাই তার সাথে গ্লোবট্রটার পর্যটকের পার্থক্য কতটুকু? নামে?

পার্থক্য জামায়। মনে পড়ে যায় নাসিরুদ্দিন হোজ্জার সেই গল্প। পার্থক্য ছেড়া জামা আর পাতাগোনিয়া জ্যাকেটে, পার্থক্য লুঙ্গি আর ক্যামোফ্লেজ জ্যাকেটের, পার্থক্য ছেড়া জামা আর ঝকঝকে নিপাট উইনিফর্মএর।

স্যার এডমান্ড হিলারিও কিন্তু বেকার মানুষ ছিলেন, ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু তে কিছুদিন কাজ করতে হয়েছিল, তারপর জানামতে উনি পাহাড় নিয়েই ছিলেন।

আমার কাছে বাবু ভাই একজন রিসার্চার, হয়তো তার প্রকাশিত জার্নাল নাই, কিন্তু যেকোন সময় উনাকে ফোন করে জিগ্গাস করা যায় পাহাড়ের ঘটনা, উনি সাথে সাথে মাথা থেকে বলে দেবেন দিন ক্ষন সহ। সিনেমা নিয়েও উনার কাছে জানতে চাওয়া যায়। আমার কাছে বাবু ভাই একজন গুরু যে নিজ হাতে আমার মত অনেককেই শিখিয়েছেন কিভাবে দড়ি বেয়ে নামতে হয়, কিভাবে মাস্ক ফ্লিপার পড়ে সাতঁরাতে হয়।

এই সব এলিট এডভেন্চারার রা নাকি তরুন সমাজের পথিকৃত, হাহ…… জানতে ইচ্ছা করে দেশের যেসব তরুন পাহাড়ে যায় (হোক না তা ৮০০ মিটার মাত্র) তাদের জন্য এরা কি করেছে? টুরিজম বোর্ডের গুড উইল এম্বাসাডার মুসা ভাই কি বান্দরবনের গাইড সিন্ডিকেশন এর বিরুদ্ধে কিছু করেছে? বড় বড় ক্লাব গুলা দেশের তরুনদের জন্য কি করছে? নাকি তাদের একমাত্র সপ্ন এভারেস্ট?

একলাফে এভারেস্ট উঠার আগে মদক টুয়াং জয় করো আগে, দেশ দেখো আগে। (নাকি স্পনসর রা রাজি হয়না?), বছরে ২০ জন নতুন তরুনকে শিখাও কিভাবে ট্রেকিং করতে হয়, কিভাবে ক্যাম্পিং করতে হয়, কিভাবে এটাকে এনজয় করতে হয়। একগাদা টাকা নিয়ে বগালেকে মাউন্টেনিয়ারিং ট্রেনিং করানো (যারা ট্রেনিং করান তাদের যোগ্যতা কি? আমার জানা মতে বাবু ভাই ও টিওবি র আবদুল্লাহ ভাই ছাড়া বাংলাদেশে কারও ইন্সট্রাকটার বিষয়ক ট্রেনিং নাই) আর কুইজ জিতে শিশির সালমান ভাইয়ের সাথে এডভেন্চার করতে যাওয়া আমার কাছে একই লাগে।

এই ব্লগে প্রাকাশিত সকল লেখা সম্পূর্ন আমার নিজস্ব মতভঙ্গি, এর সাথে আমাদের ক্লাব, অফিস, ব্যাবসা কোন কিছুর কোনও সম্পর্ক নাই 🙂

এই বিষয়ে আপনার মতামত পেলে আমি অনেক খুশি হব, কমেন্টের ঘরে লিখতে পারেন।


6 Responses to “একজন সুখি বেকার মানুষের আমড়া গাছে ঝুলাঝুলি ও আমরা”

  1. pink says:

    এই কথা টা মুসার আগেই অনেক তাচ্ছিল্য ভরে মুখে বাকা হাসি নিয়ে বলেছে এনাম তালুকদার। ওই অনুষ্ঠান উনি যে ভঙ্গিমায় বাবু ভাই কে আক্রমন করেছেন। তাতে উনার প্রতি করুনা ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নাই। অন্য আরেকজন মানুষ কে পাবলিক্লি এই রকম ভাবে ছোট করে দেখাতে যে পারে তার নিজের মহিমা যে কোথায় যায় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শেইম !

  2. হাসান মাহমুদ টিপু says:

    মুসার ওই এক কথাতেই প্রমাণ হয়ে গেছে সে আসলে এভারেস্ট নিয়ে মুনাফাটা করতে পেরেছে। সে বেকার বলতে বুঝিয়েছে তাকে যে অ্যাডভেঞ্চার, পাহাড়, সমুদ্র, চলচ্চিত্র, ছবি তোলা ইত্যাদি কাজকে তার ধ্যানজ্ঞ্যান মনে করে। বাবুভাই সেই অর্থে বেকার। আর এইরকম বেকার বলেই বাবুভাই একজন বাবুভাই, মুসার মত প্রতারক আর মিথ্যাবাদী না। মুসার মত একজন কর্পোরেট চাটুকার না। Baboo ভাই, আপনি যেরকম আছেন সেরকমই থাকুন। হিপোক্র্যাটদের কথায় মন খারাপ করার কোন কারণ দেখিনা।
    এই কয়দিনে অনেক দেখলাম রে ভাই। আর একজন আছে এনাম তালুকদার। একটা পুরোদস্তুর ভণ্ড মনে হল। আগে তাকে ভালই জানতাম। বাবুভাই যে কথাই বলতে যায় তাকে কোন না কোনভাবে আটকিয়ে দেয়। অনুষ্ঠানের শেষে মুসার বিরোধীদের জামাত বিএনপি বানিয়ে দিল। এটা কি রে ভাই!!
    আজ প্রথম আলোর পুরনো সংখ্যায় ঢু মারলাম। মুসার নিউজ ১০ দিন ব্যপি চলল চার কলাম করে। ২০১১ সালে মুহিত যখন এভারেস্ট সামিট করল সেই নিউজের একটা শব্দ নেই। ২০১২ সালের নিশাতের কথা আছে, কিন্তু মুহিতের কথা নেই।
    এটা কোন ধরনের ভণ্ডামি? আরও আছে, নিশাত আর মুহিত যখন সামিট করল দেখলাম আনিসুল হক পুরো চুপ। আমি তাকে লিখলাম, মুহিতের কথা বাদ দেন, নিশাত বাংলাদেশের একজন নারী হিসেবে প্রথম এভারেস্ট সামিট করল, আর আপনি কেন চুপ। কোন রিপ্লাই তো দিলই না। সে এই ব্যপারে আর কোনদিন লেখে নাই। হিপোক্রেসির সীমা নাই এদের।

  3. Walid Ashraf says:

    বাবু ভাই সম্পর্কে এই সুন্দর লেখাটার জন্য ধন্যবাদ! বাবু ভাই আমারো প্রথম জুমারিং, র‍্যপ্লিং এর ট্রেনার ছিলেন, এর পর আমি আরো অনেক শিখেছি কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে আমি ওনাকে দেখেছি তাতে অবশ্যই আমি তাকে এভাবেই দেখেছি। লোকটা এদিক ওদিক একটু আকটু প্যাঁচ লাগালেও আসলে অনেক উপকারি এবং নিতান্তই ঝামেলাহীন একজন মানুষ।

    তবে উনি আসলেই প্রান্তিকের ছেলে-মেয়ে দের পাহাড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আর উৎসাহ দেন। এটুকুর জন্য আমিও তাকে অনেক সন্মান করি এবং তার সম্পর্কে এমন মন্তব্য করার নিন্দা করি।
    আর মুসা ভাই আপনার বিরুদ্ধে যে প্রতারনার অভিযোগ আনা হয়েছে তা একটা পেশাগত দূর্নিতীর আর তা করা হয়েছে শুধু প্রথম আলোর সাথে না, দেশের মানুষের বিশ্বাসের সাথে।

  4. ashesb0rn says:

    pls accept heartfelt thx.

  5. Avijit Roy says:

    amio chini babu vai ke onek din dhorei..jadio vai bolei daki..tarporeo uni amar Teacher.amar photography er hatekhori onekta tar hatei..ami jani babu vai kemon manush…koi babu vai r koi chor musa…kothai rajrani r kothai chutmarani…

  6. F. M. Ziaul Ahsan says:

    অসাধারন লেখা। লেখার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।

    বাবু ভাইকে চিনি সেই ২০০৮ সাল থেকে। আমার দেখা মানুষদের মধ্যে একজন অমায়িক, মার্জিত, পরোপকারী বন্ধ’। ভ্রমন বিয়ষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ্য, বিশেষ করে পাহাড় বিয়রে। তাকে নিয়ে রুচিহীন কথা বলা কোন ভদ্র মানুষের পক্ষে শোভা পায়না। এক মাত্র জামাত-শিবির রাজাকারদের মত অসৎ, নীচ, হীন মানুদের পক্ষেই সম্ভব।

Leave a comment